একদিকে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিসৃষ্ট অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে অত্যন্ত অনিশ্চিত সময় পার করছে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে, যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আপাতত মিশ্র প্রবণতা থাকলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্য পরিস্থিতি বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠতে পারে। খবর এপি ও রয়টার্স।
বাজারে সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ কর্মদিবস শুক্রবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১৩ দশমিক শূন্য ৩ পয়েন্ট বা দশমিক ২২ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৯৬৭ দশমিক ৮৪ পয়েন্টে স্থির হয়। নাসডাক কম্পোজিট ৯৮ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট বা দশমিক ৫১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৪৪৭ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। বিপরীতে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ৩৫ দশমিক ১৬ পয়েন্ট বা দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ৪২ হাজার ২০৬ দশমিক ৮২ পয়েন্টে পৌঁছায়। পুরো সপ্তাহ বিবেচনায় ডাও সূচকে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে দশমিক ২ ও নাসডাক বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মূল কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা। তিনি জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে যুক্ত হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
ইরান জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলার মধ্যে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসবে না। ইউরোপ দেশটিকে আলোচনায় ফেরাতে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ইসরায়েল বলছে, তারা এরই মধ্যে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক রিক মেকলার বলেন, ‘সপ্তাহের শেষ দিকে এমন পরিস্থিতিতে কেউই বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চান না।’
এ উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারেও। ইরান বিশ্বে অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিও তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। এতে ভোক্তারা কম খরচ করবেন, যার প্রভাব কোম্পানিগুলোর আয়ে পড়বে। এসব আশঙ্কা থেকেই সপ্তাহজুড়ে শেয়ারবাজারে ওঠানামা দেখা গেছে।
শুক্রবার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের চলতি প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) ‘ট্রিপল-উইচিং’ দিন, অর্থাৎ দিনটিতে একই সঙ্গে স্টক অপশন, ইনডেক্স ফিউচার ও ইনডেক্স অপশনের মেয়াদ শেষ হয়। এতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়ে যায়। ওইদিন মার্কিন বাজারে ২ হাজার ৯১ কোটি শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যেখানে গত ২০ কার্যদিবসের গড় ছিল ১ হাজার ৮০৬ কোটি শেয়ার।
শুক্রবার বাজারে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ক্রোগারের শেয়ার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। কারণ কোম্পানিটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা করেছে এবং বার্ষিক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে। কারম্যাক্সের শেয়ার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। কারণ তারা আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রি করেছে।
অন্যদিকে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের শেয়ার ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার ও শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিক্রয়ে প্রভাব ফেলছে। এ প্রবণতা সামনের বছরও থাকতে পারে। এছাড়া অ্যাকসেঞ্চারের শেয়ার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। কারণ তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নতুন ক্রয়াদেশ কমেছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়েও শেয়ারবাজার অনিশ্চয়তায় ভুগছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের আর্থিক পূর্বাভাস সংশোধন বা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। কারণ সরবরাহ ও চাহিদা উভয় ক্ষেত্রেই শুল্কের প্রভাব পড়ছে। যদিও বর্তমানে অনেক শুল্ক স্থগিত রয়েছে, সবাই অপেক্ষা করছে ট্রাম্প নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি করেন কিনা।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল বলেছেন, শুল্কের কারণে গ্রীষ্মে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে। তবে ফেড কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফেড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার বলেছেন, শুল্কের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কম। তাই পরের সভায় সুদহার কমানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। তবে রিচমন্ড ফেড প্রেসিডেন্ট টম বারকিন বলেছেন, এখনই সুদ কমানোর প্রয়োজন নেই।
বন্ড মার্কেটেও সামান্য ওঠানামা দেখা গেছে। ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারির সুদহার ৪ দশমিক ৩৮ থেকে কমে ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে। দুই বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৩ দশমিক ৯৪ থেকে নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯০ শতাংশে।
আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। কারণ মে মাসে দেশটির মূল মূল্যস্ফীতি (কোর ইনফ্লেশন) বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সামনের সপ্তাহে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত, শুল্কনীতি ও ফেডের অবস্থান সবকিছুই শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।